শতাধিক হেভিওয়েটের খোঁজে দুদক ॥ দেশ ছাড়লো কিভাবে উঠছে প্রশ্ন
ছাত্র জনতার আন্দোলনের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তবর্তকালীন সরকার। নতুন সরকারের তিন মাস পার না হতেই অভিযোগ উঠেছে এক সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের হেভিওয়েট বহু সাবেক মন্ত্রী, এমপি,আমলা, পুলিশের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের অনেকেই বিপুল পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করে দেশ ছেড়েছেন। যদিও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বরাবরের মতই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
শতাধিক ভিআইপির অবস্থান নিশ্চিত হতে এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন বিমানবন্দরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে বিপুল বিত্ত বৈভবের মালিক বনে যাওয়া এই সব হেভিওয়েট কর্তারা সব নিরাপত্তাবেষ্টনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিভাবে সরকার পতনের পরপরই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন এখন সেই প্রশ্ন বারবার উঠছে। জানা গেছে, ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। দলের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে সারাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা চলে যান অনেকটাই আত্নগোপনে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী বলে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত আমলা, পুলিশ কর্মকর্তারাও নিজেদের আড়াল করে ফেলেন। কেউ কেউ আবার ভোল পাল্টে বর্তমান সরকারের আস্থা ভাজন হওয়ারও চেষ্টা চালান। সরকার চলে যাওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগ সাবেক মন্ত্রী, এমপি, কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে অনেকের বিরুদ্ধেই অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পেয়ে অনুসন্ধানে নামে দুর্র্নীতি দমন কমিশন(দুদক)। গত আড়াই মাসে অন্তত শতাধিক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য পেয়ে তাদের আইনের আওতায় আনতে মাঠে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরাও। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করার শর্তে জানান, যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম,দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাদের খুঁজে পেতে বেশ সমস্যা হচ্ছে। এদের অনেকেই পরিবারসহ বিভিন্ন সময়ে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
দুর্র্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এত কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারন করার পরও তারা কিভাবে অন্য দেশে চলে গেলেন সেই প্রশ্ন তাই বারবারই উঠছে। দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনতে এরই মধ্যে দুদকের বিভিন্ন দল কাজ করছে। তারা তাদের বিষয়ে বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে। এরই মধ্যে দুদকের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে শতাধিক প্রভাবশালীর তথ্য চাওয়া হয়েছে। তারা দেশের বাইরে পালিয়ে গেলো কিনা সংস্থাটি সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছে। তবে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের তদন্তে ইতিবাচক প্রভাব ফেরতে পারে এমন কোনো ইতিবাচক তথ্য জানাতে পারেনি বলে জানায় দুদকের ওই দায়িত্বশীল সূত্রটি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরপরই দেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদকে।
আলোচনা রয়েছে এর পর থেকেই দেশ ত্যাগের জন্য অনেক হেভিওয়েট বিমাবন্দরকে নিরাপদ মনে না করে জীবন বাঁচাতে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও সীমান্ত এলাকাকে বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। ইমিগ্রেশন পুলিশের ঊর্ধতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যারা কোনো না কোনো মামলার আসামি তাদের ইমিগ্রেশন পার হয়ে অন্য কোনো দেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট সতর্ক রয়েছি। বিমানবন্দর ছাড়াও দেশ থেকে চলে যাওয়ার অনেক পথ আছে। যারা দেশ ছেড়েছেন তারা সেইসব পথ ব্যবহার করে থাকতে পারেন। সরকার পতনের মাস পার না হতেই সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই সময় মহানগর পুলিশ কমিশনার মাইনুল হাসান গণমাধ্যমকে এই গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন।
মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নৌপথে পলায়নরত অবস্থায় রাজধানী ঢাকার সদরঘাট এলাকা হতে সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে নিউ মার্কেট থানায় রুজু হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আগস্টের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্নার লাশ উদ্ধারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় ভারতের মেঘালয় পুলিশ। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৬ আগস্ট পূর্ব জৈন্তিয়া পাহাড়ের দোনা ভোই গ্রামের একটি সুপারি বাগান থেকে পান্নার অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই এলাকাটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ অব ইন্ডিয়া (ইউএনআই) এক প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালানোর সঙ্গে পান্নার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডলার ছিল বলে দাবি করেছেন তার স্বজনরা।
পুলিশের বরাত দিয়ে এনডিটিভি লিখেছে, ওই মৃতদেহে পাওয়া পাসপোর্ট থেকে পান্নার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের কথা বলা হয়েছে। শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নও রয়েছে। কপালে ছিলে যাওয়া ও ক্ষতচিহ্নের কথা বলা হয়েছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া (ইউএনআই) লিখেছে, পান্নার কাছে প্রায় দুই কোটি ডলার ছিল বলে তার স্বজনরা দাবি করেছেন। তবে মৃতদেহ উদ্ধারের সময় কোনো মুদ্রা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পূর্ব জৈন্তিয়া পাহাড় জেলা পুলিশের প্রধান গিরি প্রসাদ। কাছাকাছি সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার দনা সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইলাম ওই সময় গণমাধ্যমকে জানান, ‘ভারতে যাওয়ার প্রাক্কালে’ সীমান্তে বিজিবির হাতে তিনি আটক হন। পরে ১৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আসাদুন নবী সাংবাদিকদের বলেন; অবৈধভাবে ভারতে পালানোর সময় দনা সীমান্ত থেকে আমরা আটক করেছি। উনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে অবৈধভাবে ভারতে পালানোর সময় সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও খুলনা-৫ আসনের সাবেক এমপি নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে আটক করে বিজিবি। পরে বিজিবির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বার্তায় এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। বিজিবি জানায়, অবৈধভাবে ভারতে পালানোর সময় ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত থেকে সাবেক ভূমিমন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে।
বহুল আলোচিত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সম্প্রতি ভারতের কলকাতার ইকো পার্কে দেখা গেছে। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরায় দেখা মিলেছে তার। এমন খবর আসার পর পুলিশ জানিয়েছে, সাবেক এই মন্ত্রী অবৈধভাবে দেশত্যাগ করেছেন। শুধু সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই নয়, আরও অনেক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে গেছেন ভারতে। তার মতো এমন অনেক হেভিওয়েট সীমান্ত দিয়ে অন্য দেশে পালিয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে গত ৩ অক্টোবর দুপুরে বিজিবি সদর দপ্তরের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, এর দায় শুধু বিজিবির কেন? অবশ্যই এ নিয়ে তদন্ত হবে, তদন্ত হচ্ছে। কোন বিওপির আওতাভুক্ত সীমান্ত এলাকা দিয়ে তারা পালিয়েছেন, তা তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশ থেকে পালানোর ঘটনায় বিজিবির দায় আছে। তবে শুধু কি বিজিবিই দায়বদ্ধ? কোন সীমান্ত দিয়ে কে পালিয়ে গেছেন, তা অবশ্যই তদন্ত করাহবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ডিজি বলেন, গত ৬ আগস্ট থেকে স্ক্রল দেখেছেন, সীমান্তপথে পালানো রোধে বিজিবিকে সহায়তা করুন। এই নির্দেশনা কেউ বিজিবিকে দেয়নি। নিজ উদ্যোগে করেছি। তখন থেকে আমরা চেষ্টা করছি। তথ্য দেওয়ার যে সব সংস্থা আছে, তারাও যদি তথ্য দেন তাহলে কাজটা সহজ হয়।