কেন্দ্রীয় বন সার্কেলে নিয়োগ বদলীতে নীতিমালা উপেক্ষিত
৩ করনিককে ম্যানেজ করে একই বিভাগে অর্ধযুগের বেশী কর্মরত অসংখ্য ফরেস্টার ॥ দেখার কেউ নেই
৩ করনিকের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ বন বিভাগের ঢাকা কেন্দ্রীয় সার্কেল। দোর্দান্ত প্রতাপশালী এই ৩ করণিক এতই ক্ষমতাধর যে তারা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খোড়াই কেয়ার করেন। তাদের ইচ্ছায় হয় লোভনীয় বদলী নিয়োগ।
বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলী সংক্রান্ত নীতিমালা-২০০৪ এ ক্ষেত্রে প্রতিনিয়িত উপেক্ষিত হলেও দেখার কেউ নেই। এই ৩ করনিক ফরেস্টার (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ অফিসার) দের বদলী নিয়োগ ফাইল তদারকির দার্য়িত্বে নিয়োজিত থেকে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত অসংখ্য ফরেস্টারগনের কাছ থেকে মাসিক মাসোয়ারা নিয়ে নীতিমালা বহির্ভূতভাবে অধিককাল লোভনীয় বন বিভাগে কর্মরত থাকার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
বদলী নীতিমালার ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ফরেস্ট রেঞ্জার, ডেপুটি রেঞ্জার, ফরেস্টার, বন প্রহরী ও বোট ম্যান এক বিভাগে সর্বাধিক ৩ বছর এবং এক সার্কেলে সর্বাধিক ৫ বছর নিয়োজিত থাকতে পারবেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় বন সার্কেলে প্রায় অর্ধ শতাধিক ফরেস্টার ও গার্ড ডিভিশনেই ৫ থেকে ৭ বছরের অধিক কাল, আবার সার্কেলে ৫ বছরের স্থলে ৭/৮ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন।
তারা প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তর, কেন্দ্রীয় বন সার্কেল ও ডিভিশনাল অফিসের সংশ্লিষ্ট করণিকের সাথে সখ্যতা গড়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লোভনীয় বন রেঞ্জ, স্টেশন, বিটে কর্মরত থেকে বনজ সম্পদ উজাড়, বনভূমি বেদখল, কাঠ পাচার সহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে মোটা অংকের অবৈধ উপার্জন অব্যাহত রেখেছেন। একস্থানে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকায় তারা নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে ড্যামকেয়ার ভাব প্রদর্শন করে দেদারছে বনজ সম্পদ উজাড়ে ভূমিকা রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রমতে এই ৩ করনিকের পৃথক দপ্তরে ফরেস্টারদের ফাইল তদারকি করে থাকেন। তাদের দায়িত্ব নীতিমালা মোতাবেক যখন যিনি বদলি/নিয়োগ যোগ্য হবেন তার ফাইলটি সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্মকর্তা গোচরীভূত করা বা বদলী নিয়োগ সভায় উপস্থাপন করা। কিন্তু মাঠে কর্মরত যারা ঐ ৩ জনের সাথে যোগাযোগ রাখেন তাদের ফাইলটি উপস্থাপন করা হয় না বলে অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ডিএফও/সিএফ/এমনকি সিসিএফ সাহেব ও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত না হওয়ায় সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।
কেন্দ্রীয় অঞ্চল ঢাকার নিয়ন্ত্রণাধীন ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, সিলেট বন বিভাগে প্রায় অর্ধ শতাধিক ফরেস্টার/গার্ড নীতিমালা বহির্ভূতভাবে কর্মরত আছে। তারা দীর্ঘ ৫/৬/৭ বছর সময়কাল একই স্থানে কর্মরত থেকে দুর্নীতির মাত্রা কয়েকগুণ বাড়িয়ে বনজ সম্পদ উজাড়ে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন বলেও সূত্র জানায়। এতদ্বসংক্রান্তে প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তরে কর্মরত সাবেক অফিস সহকারী বর্তমান হিসাব রক্ষক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত এমদাদুল হকের সাথে আলাপকালে তিনি জানান গত ২০১০ সাল থেকে দীর্ঘ ১ যুগ সময়কাল তিনি সমগ্র বন বিভাগে কর্মরত ফরেস্টারদের ফাইল তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত আসছেন।
সিসিএফ দফতরের প্রতিটি বদলী মিটিংয়েই তিনি বদলীযোগ্যদের তালিকা উপস্থাপন করে থাকেন। তবে মিটিংয়ে কোন সিদ্ধান্ত না হলে তার কিছু করার নেই। কেন্দ্রীয় বন সার্কেলের নক্সাকার (অতিরিক্ত দায়িত্বে অফিস সহকারী) মো: বাকী বিল্লাহ গত ৬ বছর নাগাদ ঢাকা কেন্দ্রীয় বন সার্কেলে কর্মরত ফরেস্টারদের ফাইল দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তিনি বলেন, বন সংরক্ষক মহোদয়ের বদলী সংক্রান্ত প্রতিটি সভায় বদলীযোগ্যদের তালিকা তিনি উপস্থাপন করে থাকেন। সভায় কোন সিদ্ধান্ত না হলে তারও কিছু করার নেই।
ঢাকা বন বিভাগের প্রধান সহকারী আতিয়ার রহমান ফরেস্টারদের ফাইলসমূহ দেখাশুনার দায়িত্বে গত ১ বছর ধরে নিয়োজিত আছেন। তিনি রাত ১১ টা পর্যন্ত অফিসে কাজ করেন। শনিবারও অফিস করেন। বাড়তি কোন সুযোগ পান না। ডিভিশনে কর্মরত কারো কাছ থেকেও তিনি কোন মাসোয়ারা নেন না বলে জানান। রাত ১১টা পর্যন্ত অফিসে কি কাজ করেন এটা নিয়েও সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় সার্কেলে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক করনিক জানান নীতিমালা বহির্ভূতভাবে যাদেরকে অধিককাল সময় নিয়োজিত রাখা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই ঐ করণিক গনের সাথে সখ্যতা থাকায় তাদের ফাইলটি বদলী মিটিংয়ে উপস্থাপন করা হয় না। কারণ তারা বিভিন্ন বিভাগে লোভনীয় পদে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োজিত থেকে বনজ সম্পদ উজাড়, কাঠ পাচার বনভূমি বেদখল করিয়ে মোটা অংকের উপার্জন অব্যাহত রেখে সংশ্লিষ্ট করণিকদের মাসিক মাসোয়ারা দিয়ে থাকেন। এ কারণেই তারা স্বúদে দীর্ঘদিন বহাল থেকে যান। ফলে অনেক দক্ষ বন কর্মকর্তা-কর্মচারী সারা জীবন থেকে যায় অবহেলিত।
তবে সারাদেশে বিভিন্ন বন বিভাগে যে সমস্ত ফরেস্টারগন কর্মরত আছেন তাদের মধ্যে লোভনীয় বন বিভাগে কর্মরতদের বন ভবনে কর্মরত করণিক সহ সংশ্লিষ্ট বন সার্কেলের এবং বনবিভাগের করনিকের সাথে মাসিক আর্থিক যোগাযোগ রাখতে হয়। আর এ কারণেই করনিকগণ বৈধ আয় বহির্ভূত বিলাসবহুল জীবনযাপন করে থাকেন। যা তাদের জীবনযাত্রার মান ও সহায় সম্পত্তির বিষয়ে গোপন পর্যালোচনায় প্রমাণিত হবে।
বন বিভাগে বদলী নিয়োগ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে নীতিমালা বহির্ভূত ভাবে এই সার্কেলে অধিক সময় কর্মরতদের বিষয়টি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের তদারকি করে নীতিমালা মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহন প্রয়োজন বলে মনে করেন কয়েকজন বন বিশেষজ্ঞ। উল্লেখ্য বদলী সংক্রান্ত নীতিমালা ২০০৪ এর ১(ঙ) অনুচ্ছেদে পরিষ্কার উল্লেখ আছে অনিয়মিত বদলি শৃঙ্খলা পরিপন্থী। প্রতিটি বদলী ও নিয়োগের আদেশ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের গার্ড ফাইলে পর্যায়ক্রমে সংরক্ষণ করতে হবে।
পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাগণ পরিদর্শনকালে উহা অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখবেন। এক্ষেত্রে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাগণ গার্ড ফাইল পরীক্ষা করলেও অধিক সময়কালে নিয়োজিতদের বিষয়টি অজ্ঞাত কারণে ওভার লুক করে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।