বদলী, নিয়োগ, টেন্ডার, ঠিকাদারী সব তার নিয়ন্ত্রণে
সিবিএ সভাপতি আবুল হোসেন এখন বিআইডব্লিউটিএ’র রাজা
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)তে সিবিএ’র সভাপতি আবুল হোসেনের রাজত্ব চলছে। কৌশলে নিয়োগ বাণিজ্য, বদলী বাণিজ্য,ঠিকাদারী বাণিজ্য সহ অবৈধভাবে অঢেল সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনিয়মের মাধ্যমে নামে-বেনামে এসব সম্পদ অর্জন করায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার পর তা তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। কিন্তু তারও ফলাফল শুন্য। রাজনৈতিক প্রভাব আর টাকার ভারে সে সব অপরাধ চাপা পড়ে আছে বছরের পর বছর। আর সেই সুযোগে বিআইডব্লিউটিএতে আবুল হোসেন এখন ‘রাজার রাজা’ বনে গেছেন। গত প্রায় এক দশক ধরে তিনি সিবিএ নেতার ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রিয় এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিতর্কিত করে ফেলেছেন।
বানিয়েছেন লুটপাটের আখড়া। কথায় কথায় কর্মকর্তাদের হুমকি ধামকি দেওয়ার পাশা পাশি বদলী,নিয়োগ,টেন্ডার খাতে অবৈধ হস্তক্ষেপ করে নিজের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। নিজে একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি হলেও ব্যবহার করছেন অফিসারদের জন্য বরাদ্দকৃত গাড়ী। সিবিএ অফিসটাকে বানিয়েছেন সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত এলাকা। সেখানে বসে নানা প্রকার অনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন।
বিআইডব্লিউটিএ ভবনে তার অবিশ্বাস্য দাপট দেখলে যে কোন সচেতন নাগরিকই বিস্মিত হবেন। সিবিএ নেতা আবুল হোসেনের একাধিক নিকটাত্মীয় বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন পদে চাকরি করছেন। আবুলের ভাগিনা আলামিন চাকরি করেন লস্কর পদে। ২য় শ্রেণির কর্মচারী হলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ-নির্দেশের ধার ধারেন না তিনি। আবুলের ভাই মেহেদী হাসানও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মচারী। তবে মেহেদীর চাকরি হয় বড় ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে। বয়স জালিয়াতি করে মার্কম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয় তাকে।
আবুলের মেয়ের জামাই বিআইডব্লিউটিএ’র তালিকাভুক্ত ঠিকাদার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিএ’র এক কর্মকর্তা বলেন, আবুল হোসেন নিম্নমান সহকারী হিসেবে চাকরিতে ঢোকেন। পরে সহকারী হিসেবে তার পদোন্নতি হয়। তবে সিবিএ’র নেতাগিরি করার জন্য তিনি আর পদোন্নতি নিতে রাজি নন। এমনকি নিজের পদোন্নতি আটকে রাখতে নিজেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এসিআর বুকে নেতিবাচক মন্তব্য লিখিয়ে নেন। আবুলের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়।
নিজের এলাকায় তিনি আদম ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। গত ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দুদক চেয়ারম্যান বরাবর একটি অভিযোগ দায়ের করেন বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের মেডিকেল এটেন্ডেন্ট মো. মুজিবর রহমান। অভিযোগে উল্খে করা হয়- তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও আবুল হোসেন সরকারি ও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন। তাদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিআইডব্লিটি’র একাধিক কর্মচারী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার পাশাপাশি ভুয়া মামলায় আসামিও হয়েছেন।
এমনকি বদলি, বরখাস্ত করা হয়েছে বেশ কয়েক কর্মচারীকে। দুই নেতার অনাচার থেকে বাঁচতে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো অভিযোগকারীদের নানাভাবে হয়রানি ও নাজেহালের শিকার হতে হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি আবুল হোসেন প্রভাব খাটিয়ে তার জামাতার (মেয়ের স্বামী) নামে করা লাইসেন্সে (এআরটেল বিডি লিমিটেড) বিআইডব্লিউটিএতে রমরমা ঠিকাদারি ব্যবসা করছেন।
এভাবে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি। যদিও বিধি অনুযায়ী বিআইডব্লিউটি’র কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা তাদের নিকটাত্মীয় এই সংস্থার লাভজনক কাজে যুক্ত হতে পারেন না। জানাগেছে,গত বছর জুলাই মাসে সিলেটের গোয়াইন ঘাটে সালিটিকর ঘাটে একটি ৮০ ফুট জেটি নির্মানের জন্য কাজ পায় ঢাকার মেসার্স তানিয়া এন্টাপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্ত সিডিউল মোতাবেক ৯০ ফুট দীর্ঘ এ্যাপ্রোচ সড়ক ও ৮০ ফুট দীর্ঘ নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ না করেই কেবলমাত্র ৫০ ফুটের একটি স্টিল অবকাঠামো নির্মান করেই ৫০ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা বিল তুলে নেয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি সভাপতি আবুল হোসেনের জামাইয়ের অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে। এছাড়া আবুল হোসেন প্রভাব খাটিয়ে আপন ছোট ভাই চল্লিশোর্ধ বয়সী মেহেদী হাসানকে অষ্টম শ্রেণি পাস দেখিয়ে বিআইডব্লিউটি’তে মার্কম্যান পদে চাকরি দিয়েছেন। বিষয়টি জানাজনি হলে তাড়াহুড়া করে জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স সংশোধন করার চেষ্টা করে তবে এ পর্যন্ত পরিবর্তন করতে পারেনি। তবে মেহেদীর এইচএসসি পাসের সনদে দেখা যায়, তার বয়স চল্লিশের বেশি। অভিযোগে বলা হয়েছে, আবুল হোসেন অবৈধ আয়ের অন্যতম উৎস কর্মচারী নিয়োগ ও বদলি।
গত ৩ বছরে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়, ড্রেজারসহ বিভিন্ন জলযান, নদীবন্দর ও শাখা কার্যালয়গুলোতে বিভিন্ন পদে ৫ শতাধিক কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত দেড়শ’ নিয়োগ দেয়া হয়েছে আবুল হোসেনের তদবিরে। এই নিয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। এছাড়া এ সিবিএ নেতা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ২০০ কর্মচারীকে বদলি ও বদলিকৃতদের পছন্দের স্থানে পদায়ন করিয়েছেন। এর বিনিময়ে তারা প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সিবিএ সভাপতির এসব অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করায় সংগঠনের কয়েকজন নেতাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করিয়েছেন। তাদের কয়েকজন হলেন বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের ১নং যুগ্ম সম্পাদক সঞ্জীব দাশ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক তুষার কান্তি বণিক, মুজিবর রহমান ও মাযহার হোসেন। বিআইডব্লিউটিএর একটি সূত্রে জানা গেছে, সিবিএ সভাপতি আবুল হোসেন বিআইডব্লিউটিএর একজন পরিচালকের গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-গ ৩৭-৭৪৩৭) ২০১৬ সালের জুলাই থেকে গত ১১ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ব্যবহার করেছেন। শুধু তাই নয়, গাড়ির পেছনে ব্যয় হওয়া প্রায় ৭ লাখ টাকার জ্বালানি এবং চালকের বেতন-ভাতা ৫ লাখ টাকা বহন করেছে কর্তৃপক্ষ।
দুদক এক অভিযান চালিয়ে পিডিবির দুই সিবিএ নেতার দখলে থাকা দুটি গাড়ি উদ্ধারের পর বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ আবুলের গাড়ি প্রত্যাহার করেছে। তবে আবুল হোসেন দীর্ঘদিন বেআইনিভাবে গাড়িটি ব্যবহার করেছেন- এই তথ্য ধামাচাপা দেয়ার জন্য লগবুকসহ দাপ্তরিক আলামতগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চেয়ারম্যানের অজ্ঞাতে প্রকল্পের গাড়ী ব্যবহার করছেন।