গণপূর্তে নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াসের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন
দুর্নীতি আর অনিয়মে জর্জরিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের আজিমপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিস। সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদকে প্রায় অর্ধযুগ একই ডিভিশনের দায়িত্বে বহাল রাখায় তিনি একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট তৈরী করে সরকারি অর্থ তছরুপসহ নানা অনিয়মে জড়িয়েছেন। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে টিকে আছেন ইলিয়াস আহমেদ।
তার সম-সাময়িক অনেকই নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন কিন্তু মো. ইলিয়াস আহমেদ পদোন্নতি পাননি। তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। তিনি ওই পদে থেকেও অন্য কোথাও বদলি হতে চান না। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গত ৭ বছর ধরে গণপূর্ত বিভাগে আজিমপুর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চাকরি করছেন। গত বছর তিনি প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার কাজ শেষ করেছেন। সেখান থেকে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘোষণা দিয়ে তিনি ১৫ শতাংশ হারে ঘুষ খেয়েছেন। নতুন অর্থ বছরে আরও ৭০০ কোটি টাকার কাজ হওয়ার কথা রয়েছে। সেকারনে তিনি আজিমপুর জোন থেকে অন্য কোথাও বদলি হতে চান না।
অভিযোগ উঠেছে, গণপূর্তের ঢাকার আজিমপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহমেদ ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ঠিকাদারদের হয়রানি করছেন। পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া তিনি কাউকে কাজ দেন না। এ নিয়ে একজন বেশ ঠিকাদার গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর অভিযোগও দিয়েছেন। এরকম অভিযোগের কপিসহ বেশ কিছু ডকুমেন্টস আজকের সংবাদের এসেছে।
অভিযোগের পর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহমেদ ওই ঠিকাদারকে নাজেহাল করতে ব্যাপকভাবে কার্যক্রম চালান। অধস্তন কর্মকর্তাদের দিয়ে ওই ঠিকাদারকে ডেকে পাঠান। তাকে নানারকম হুমকি দেন। এমনকি গণপূর্তে তার প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করারও হুমকি দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ওই ঠিকাদার প্রধান প্রকৌশলী বরাবর আবারও অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি এখনো ওই ঠিকাদারকে ডাকেননি।
অভিযোগকারী ঠিকাদার পল্টু দাস বলেন, দুর্নীতি করে রাঘব বোয়াল হয়েছে ইলিয়াস আহমেদ। নিজ হাতে ঘুষ নিয়েছেন তিনি। এর বাইরে কোনোভাবেই তিনি বিল দিতে রাজি হননি। পরবর্তীতে আরও ঘুষ দাবি করলে আমি রাজি হইনি। এজন্য তিনি বিল কম দিয়েছেন। অথচ পুরো কাজই শেষ করতে হয়েছে আমাকে। তদন্ত কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি হয়েছে এমন একটি চিঠি পেয়েছি। তবে এখনো ডাকেনি আমাকে।
তদন্ত কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের তত্তাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) নন্দিতা রাণী সাহা বলেন, ঠিকাদার পল্টু দাসকে নানাভাবে নাজেহালের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এখানে অভিযুক্ত করা হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমদকে।
ঠিকাদারের অভিযোগ, ইলিয়াস আহমেদের হাত অনেক বড়। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, অনেক টাকা খরচ করে ওই পদে টিকে আছেন তিনি। সহজেই তাকে সরানো যাবে না। এজন্য তিনি যেভাবে চান সেভাবেই কাজ করেন। তবে ইলিয়াস আহমেদের বিষয়ে গণপূর্তের একাধিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য দিয়েছেন।
অভিযোগ দেওয়ার পর ইলিয়াস আহমেদ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভূক্তির হুমকিও প্রদান করেন। আবার কোনো কোনো ঠিকাদারকে ডেকে সামান্য ঘুষ নিয়ে আবার অনেকের কাছে ঘুষ ছাড়াই বিল পরিশোধ করেছেন। এরপর তিনি বলেন, তার চেয়ারের ছয়টি পা। দুই পা তার এবং চার পা চেয়ারের। তাই ছয় পা যে চেয়ারের রয়েছে সেই চেয়ারকে সহজে কেউ নাড়াতে পারেন না।
মেসার্স এম.এ আলী এন্টারপ্রাইজ নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বতাধিকারী পল্টু গত ২৯ মার্চ ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর ডাকযোগে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ই-জিপি টেন্ডারে আজিমপুর বিভাগে একটি কাজ পাই। নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদ আমাকে ডেকে দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাজ শেষে বিল দাখিলের পর আবারও মোট বিলের ১০% টাকা দাবি করেন ইলিয়াস। বিল পাওয়া নিয়ে ঝামেলা হবে ভেবে বাধ্য হয়ে প্রকৌশলী ইলিয়াসকে ৫৫ হাজার টাকা ঘুষ দেই।
চাহিদা মত ঘুষ না দেওয়ায় প্রায় দুই বছর ঘুরিয়ে একাধিক কিস্তিতে আমাকে বিল দেওয়া হয়েছে। এমনকি টেন্ডারে কাজ প্রাপ্তির সময় জামানত হিসেবে দেওয়া ১ লাখ ১৬ হাজার ৫শ টাকার চেক ইস্যু হওয়ার পরেও অনেক ঘুরিয়ে আমাকে চেক দেওয়া হয়। সামান্য ১১ লাখ টাকার কাজের বিলের জন্য প্রকৌশলী ইলিয়াস আমাকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন এবং ক্ষতি করেছেন। আমি এমন স্বৈরাচারী এবং সাধারণ ঠিকাদারদের জন্য ক্ষতিকর চরিত্রের প্রকৌশলীর বিচার দাবি করছি।
ঠিকাদার পল্টু অভিযোগ করে বলেন, প্রকৌশলী ইলিয়াস ব্যাপক অদৃশ্য ক্ষমতার অধিকারী। গণপূর্তে এমন কোনো ঠিকাদার পাবেন না যিনি একই চেয়ারে ৬/৭ বছর ধরে আছেন।
গণপূর্ত অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইলিয়াস আহমেদ কিভাবে এত সময় ধরে আজিমপুর বিভাগের দায়িত্বে আছেন, তা এ দফতরের সবার কাছেই বিশেষ কৌতূহলের বিষয়। গণপূর্তে এমন নজির খুব কমই আছে। অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী পদে থাকা কর্মকর্তাও তার সঙ্গে বা তার বিষয়ে হিসেব করে কথা বলেন।
এর আগে পল্টু বেশ কয়েকবার ইলিয়াস আহমেদের বিষয়ে অভিযোগ করলেও সেই অভিযোগপত্র গায়েব হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের ভাষায়, অভিযোগের কাগজ গায়েব আর অভিযোগ করলে সেই প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভূক্ত করলে পরবর্তীতে কেউ আর অভিযোগই করতে আসবে না। যেখানে অভিযোগের বিষয়টি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সেখানে অভিযোগকারীকেই হেনস্থা করা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহমেদকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর তার স্টাফ অফিসার মাহফুজ আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।