জোতের আড়ালে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি বন অধিদপ্তরের উর্ধতন মহলের মদদে এবার লামায় রেঞ্জার কবিরের নতুন ‘ডিপো-টিপি’ কেলেঙ্কারি (৪র্থ পর্ব)
বান্দরবানের লামা বন বিভাগের বিতর্কিত ও চিহ্নিত ‘বনখেকো’ সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) কে এম কবির উদ্দিনের একের পর এক নজিরবিহীন দুর্নীতি ও কাঠ পাচার কেলেঙ্কারি প্রকাশ পাওয়ার পরও কোনো অদৃশ্য শক্তিবলে তিনি আইনের তোয়াক্কা না করে তাঁর জালিয়াতির সাম্রাজ্য প্রসারিত করে চলেছেন।
রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পের হাতে সেনাবাহিনীর অভিযানের পরও অবৈধ কাঠবোঝাই দুই ট্রাক ধরা পড়া, সচল ট্রাকে অলৌকিক পরিমাপের ‘ইউডিওআর’ মামলা সাজানো, সিসিএফ ও সিএফ মিহির কুমার দো’র প্রত্যক্ষ আশ্রয়ে সাজানো তদন্ত কমিটি দিয়ে জাল আলামত বৈধ করার চেষ্টার পর এবার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রেঞ্জার কবিরের জেলা প্রশাসক সহ সকল কার্যালয়ের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে ভূয়া টিপি দিয়ে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে কাঠ পাচারের এক সম্পূর্ণ অভিনব ও দুর্ধর্ষ কৌশল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা স্বয়ং প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) এবং সিএফ আর এস এম মনিরুল ইসলাম, সিএফ মিহির কুমার দো ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মাসুদ আলমের প্রত্যক্ষ মদদ ও ব্যাকআপ পেয়ে লামা সদর রেঞ্জে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নতুন এই ‘ডিপো-টিপি’ জালিয়াতি বাণিজ্য চালু করেছেন কবির।
এই নতুন কৌশলে রেঞ্জার কবির তাঁর সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত প্রভাবশালী কাঠ ব্যবসায়ী আরিফসহ একাধিক চোরাকারবারির সাথে গোপন বৈঠক করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে সময় ও অর্থ ব্যয় করে আর বৈধ ‘এ-ফরম’, জোত পারমিট কিংবা ‘ডি-ফরম’ ইস্যুর ঝামেলায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জায়গা ও সংরক্ষিত বন থেকে অবৈধভাবে সেগুন কাঠ কেটে এনে সরাসরি তাঁদের মেরাখোলাস্থ নিজস্ব ডিপোতে মজুদ করবেন, আর সেখান থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে কবির নিজ দায়িত্বে অবৈধ টিপি (চলাচল পাস) বানিয়ে কাঠ পাচারের নিরাপদ রুট তৈরি করে দেবেন, যার বিনিময়ে প্রতি ঘনফুট কাঠ বাবদ রেঞ্জার কবির ও এসিএফ মাসুদ আলমকে একচ্ছত্রভাবে ৪৫ টাকা করে নগদ কমিশন দিতে হবে।
এই জাদুকরী চুক্তির সরাসরি ধারাবাহিকতায় প্রফেশনাল কাঠ ব্যবসায়ী আরিফ লামা রেঞ্জের রূপসীপাড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডের মাস্টার পাড়া এলাকা হতে অবৈধভাবে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২ একর সেগুন বাগান ৮ লক্ষ টাকায় এবং অপর এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ একর সেগুন বাগান ২০ লক্ষ টাকায় কিনে সরকারি কোনো প্রকার অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই প্রকাশ্য দিবালোকে সেগুনগাছ কেটে উজাড় করা শুরু করেছেন। সরকারি নির্দেশিকা ও প্রচলিত বন আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব অবৈধ সেগুন কাঠ রূপসীপাড়ার মাস্টার পাড়া থেকে এনে লামা সদরের মেরাখোলাস্থ আরিফের কাঠের ডিপোতে মজুদ করা হচ্ছে এবং চুক্তি অনুযায়ী ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি ভুয়া টিপি বাগিয়ে নিয়ে লাখ লাখ টাকার সরকারি কাঠ অনায়াসে সমতলে পাচার করা হয়েছে।
বনের রক্ষক হয়ে যখন সিসিএফ, সিএফ ও এসিএফের সরাসরি আশীর্বাদে একজন ডেপুটি রেঞ্জার এভাবে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে চোরাই কাঠ পাচারের রামরাজত্ব গড়ে তোলেন, তখন পাহাড়ের পরিবেশ ও পরিবেশবাদীদের আর আকুতি জানানোর জায়গা থাকে না; সচেতন নাগরিক সমাজ এখন আশু বনাঞ্চল রক্ষা ও রাজস্ব লুণ্ঠন বন্ধে এই সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানাচ্ছেন।