ক্ষমতার ছায়ায় অনিয়মের সাম্রাজ্য
উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ-বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ
ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অনিয়ম ও কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম ফকির (ওরফে জুনুন)-এর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। সরকারি চাকরিতে যোগদান থেকে শুরু করে বিধি-বহির্ভূতভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হওয়া, অবৈধ পন্থায় আত্মীয়কে চাকরি দেওয়া, জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য পরিবর্তন, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎসহ একাধিক অনিয়মে জড়িত ছিলেন শাহ মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম ফকির (ওরফে জুনুন। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্রের আইন, সরকারি বিধিমালা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শাহ মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম ফকির ২০০৯ সালে সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় নিজের প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে নানার বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের মাধ্যমে সেই ঠিকানাই স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়নপত্র অনুযায়ী তাঁর প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার নগরকচুরী গ্রামে। এছাড়াও তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নান্দাইল উপজেলার দিলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অথচ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধান, ২০০৯ (সংশোধিত)-এর বিধান অনুযায়ী এ ধরনের পদে তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই ।
তথ্যসূত্র সূত্রে জানা যায়,সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর একক প্রভাব বিস্তার করেন তিনি । বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠনের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভুয়া ব্যয় ভাউচার তৈরি, বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম ব্যয় দেখানো এবং বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে বিদ্যালয়ের কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি সহ শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে সচেষ্টদের অভিমত।
এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দা, বিদ্যালয়ের সাবেক সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে নোটিশ পাঠানো হয়। পরবর্তীতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শাহ মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম ফকির (ওরফে জুনুন)সভাপতি থাকাকালে নিজের চাচাতো ভাইকে বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দিতে বয়স ও পরিচয় পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির ব্যবস্থা করেন। তথ্যসুত্রে উঠে আসে, পুরোনো জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স সরকারি চাকরির নির্ধারিত সীমার বাইরে থাকলেও নতুন পরিচয়পত্রে বয়স কম দেখিয়ে চাকরি দেওয়া হয়। একই ব্যক্তির নামে ভিন্ন ঠিকানায় দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার বিষয়টি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এহেন কর্মকান্ডে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।
সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে বৈধতা দিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে চাপ প্রয়োগ করে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর তিনজনকে আজীবন দাতা সদস্য করার নামে অর্থ গ্রহণ করা হলেও সেই অর্থ বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে ।বিদ্যালয়ের পাঁচটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ-বাণিজ্য সংঘটিত হয়েছে ।এসব ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ তলানিতে পৌচেছে। যা এলাকাবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে শাহ মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম ফকির (ওরফে জুনুন) এর কাছে জানতে চাইলে তিনি সমস্ত অভিযোগে পাশ কাটিয়ে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।
উত্থাপিত অভিযোগগুলো দ্রুত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসি জোর দাবি জানিয়েছেন।