প্রকল্প পরিচালক অসীম দাসের পেটে প্রাণিসম্পদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির আর্থ সামাজিক ও মান উন্নয়ন প্রকল্পের সিংহভাগ টাকা!

প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর এখন প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক অসীম দাসের পেটে প্রাণিসম্পদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির আর্থ সামাজিক ও মান উন্নয়ন প্রকল্পের সিংহভাগ টাকা!

প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর এখন প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ প্রকল্পই পকেট প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে তা প্রকল্প পরিচালকের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ভেস্তে যাচ্ছে। ফলে কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি। এনিয়ে মন্ত্রণালয় ও দুদকে অভিযোগের পর অভিযোগ জমা পড়লে শুধুমাত্র তদন্ত কমিটি গঠন হয়, কোনো শাস্তি হয়না। ফলে প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় করেও পরিচালকরা রয়েছেন বহাল তবিয়তে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির আর্থ সামাজিক ও জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত প্রাণী সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ডিপিপি ০১/০১/২০১৯ থেকে ৩০/০৬/২০২৩ এবং সংশোধিত ডিপিপি ০১/০১/২০১৯ থেকে ৩০/০৬/২০২৪ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ডিপিপি ৩৫২০৩,০০ লক্ষ টাকা এবং সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯১৫২,৩১ লক্ষ টাকা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে সুফলভোগীর সংখ্যা নির্ধারণ পূর্বক ৪টি অঞ্চল- মধ্যাঞ্চল, উত্তর পূর্বাঞ্চল, উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও উপকুলীয় দক্ষিনাঞ্চল ভাগ করে ১,৩৭,৯৭৬টি সুফলভোগী পরিবারের মাঝে অনুদান বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত ১,৩৭,৯৭৬টি পরিবারের মাঝে ৭টি প্যাকেজে উন্নত জাতের ক্রস ব্রিড গাভী, ৬৯১০টি পরিবারকে ১টি গরু, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও ৩ মাস ব্যাপি খাদ্য সরবরাহ।

৩৪৫৭৮টি পরিবারকে দেশি মুরগী ২০টি, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও ৩ মাস ব্যাপি খাদ্য সরবরাহ। ৩৪৫২৮টি পরিবারকে হাস ২০টি, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও খাদ্য সরবরাহ। ২০২৪৬টি পরিবারকে ২টি করে ব্লাক বেঙ্গল ছাগল, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও ৩ মাস খাদ্য সরবরাহ। ২৬৩৩৯টি পরিবারকে ২টি ভেড়া, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও ৩ মাস খাদ্য সরবরাহ। ৮৪৬০টি পরিবারকে ১টি মহিষ, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও ৩ মাস খাদ্য সরবরাহ। ৬৯১০টি পরিবারকে ১টি প্রাপ্ত বয়স্ক গরু, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও ৩ মাস খাদ্য সরবরাহ করা। এমনকি, প্রতিটি প্যাকেজে গাভী ও মহিষ মোটাতাজাকরণে এককালীন ৭ হাজার টাকা, ছাগল ও ভেড়া ৫ হাজার টাকা, হাস ও মুরগী ৩ হাজার টাকা করে প্রদান করা হবে। কিন্তু সঠিকভাবে অর্থ ব্যয় না হওয়ায় প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক চলছে।

জানা যায়, ৩৯১ কোটি, ৫২ লক্ষ ৩১ হাজার টাকার প্রকল্প ২৯টি জেলার ২১০টি উপজেলায় বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির দারিদ্র্য বিমোচন, জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য পরিপূর্ণ হবে। কিন্তু কেনা-কাটায় কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক অসীম কুমার দাসের বিরুদ্ধে। কেননা, উন্নত জাতের গরুর ডিপিপি মূল্য ৬১,০০০ টাকা, সোনালী মুরগী ২০টি ৫,০০০ টাকা, হাস ২০টি ৬,০০০ টাকা, ছাগল ১২,০০০ টাকা, ভেড়া ১২,০০০ টাকা ও মহিষ ৫৫,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও প্রাণী ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে।

তাছাড়া প্রতিটি প্রাণীর প্রতিদিনের খাদ্য-গাভী ২.৫০ কেজি, গরু ৩.০০ কেজি, ছাগল ০.৩০ কেজি, ভেড়া ০.৩০ কেজি, মুরগী ০.১০ কেজি, হাস ০.১০ কেজি, মহিষ ২.০০ কেজি। এই হিসেবে ডিপিপিতে তিন মাসের ৩৩ কোটি ৫৬ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা সংস্থান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ১৬ কোটি ৭৮ লক্ষ ৭ হাজার ৫ শত টাকার খাদ্য ক্রয় করে সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি অর্থের হিসেব পিডি ছাড়া কারো জানা নেই। গাজীপুর ও টাংগাইলসহ বেশকটি এলাকার সুফলভোগীদের সাথে আলাপ করলে (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) তারা বলেন, শুধুমাত্র ১ মাসের খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ে তারা কথা বলতে নারাজ। এতে ভবিষ্যতে কোনো সহায়তা না পাবার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সুফলভোগীদের তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়াও হতে পারে।

সুফলভোগীদের সহায়তায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্রস ব্রিড গাভী ৬৯১০টি যার ডিপিপি মূল্য ঘর নির্মানসহ ৪৬৯,৮৮০,০০০ টাকা। প্রতি গরুতে আর্থিক ক্ষতি ৬৮,০০০-৪০,০০০=২৮,০০০ টাকা। মোট ক্ষতি হয়েছে ১৯,৩৮,৬০,০০০ টাকা। এমনিভাবে মুরগী, হাস, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ ক্রয়ে অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্প পরিচালক অসীম কুমার দাস ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেনটেক ইন্টারন্যাশনালের যোগসাজশে সিংহভাগ অর্থ ভাগ-ভাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

ভুক্তভোগী ঠিকাদার বলেন, প্রতিষ্ঠানটির মালিক ধীরেন দাস খুশি হয়ে প্রকল্প পরিচালককে একটি হেরিয়ার জীপ গাড়ি উপহার দিয়েছেন, যার নম্বর ঢাকা- মেট্রো-ঘ-১৮-৮৪৫৩। অন্য ঠিকাদাররা বলেন, পিডি এই প্রকল্পের দরপত্রে এমন কিছু শর্ত সংযুক্ত করেছেন যা মূল্যায়ন কমিটির অগোচরে করা হয়েছে। যার ফলে, গোপনে চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানই দরপত্রের কার্যাদেশ পায়। সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের এপিএস হিলটন সাহার কল্যাণে প্রকল্পের পিডি হওয়ার সুযোগে তিনি যা ইচ্ছে তাই করছেন।

এদিকে প্রকল্পের অঞ্চল ভিত্তিক সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা সব বিষয়ে জানলেও অন্যান্য সদস্যগণ অর্থ প্রদান, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মান ও প্রাণী ক্রয়ে নয়ছয় করার বিষয়ে অবহিত নন। পিডির নির্দেশে ২১০টি উপজেলার কর্মকর্তারা সুবিধা পেতে অনিয়মে জড়িয়েছেন। একারণে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই পিডির পকেটে গেছে। তিনি ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে অধিদপ্তরে একচেটিয়া রাজত্ব করছেন। যেখানে সরকারি বিধিমালায় কোনো স্থানে ৩ বছরের অধিক থাকার নিয়ম নেই, সেখানে টানা ৯ বছর জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ঢাকায় কর্মরত ছিলেন।

এমনকি, শাস্তিমূলক বদলী হয়ে জাতীয় চিড়িয়াখানায় টানা ১১ বছর ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে কর্মরত থেকে হাজারো অনিয়ম করার পরও মন্ত্রণালয়ের কিছু দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তার আর্শীবাদে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। চিড়িয়াখানার পশু খাদ্যে ক্রয়ে সকল দরপত্র পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা ও বর্তমান প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে কলকাতার সল্টলেকের বি ব্লকে আলিশান ফ্ল্যাট ও আর কে মিশন রোডে ৩টি ফ্ল্যাট ক্রয় করার কথা শোনা যায়। তার ব্যাংক ব্যালেন্সের হিসেব অজানাই রয়ে গেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেশ প্রেমিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা এই প্রকল্পের প্রতিটি ফাইল নীরিক্ষা করে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দুদক চেয়ারম্যানের পদক্ষেপ কামনা করেছেন। এ বিষয়ে কথা বললে পিডি অসীম কুমার দাস বলেন, আমি কোন প্রকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিই না। আমার কিছু প্রতিপক্ষ কলিগ এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।