দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো বগুড়া ফেস্ট -২০২৫

বিভিন্ন প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গুণীজন সংবর্ধনা, আলুঘাটি ও দই উৎসবসহ নানা লোকজ আয়োজনে এবারই প্রথম বগুড়া ফেস্ট-২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো বগুড়া ফেস্ট -২০২৫

বিভিন্ন প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গুণীজন সংবর্ধনা, আলুঘাটি ও দই উৎসবসহ নানা লোকজ আয়োজনে এবারই প্রথম বগুড়া ফেস্ট-২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক বিশিষ্ট সাংবাদিক আতিকুর রহমান রুমন ও  সদস্য সচিব জুলফিকার হুসাইন সোহাগসহ উপস্থিত ছিলেন বগুড়ার সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা।

বগুড়া ফেস্টটিতে নানা আয়োজনের মাঝে সবচেয়ে বেশি যেটি আলোড়ন তুলছে- তা হলো আলুঘাটি ও দই। বগুড়ার কথা বলতে গেলে কিছু জিনিস চোখের সামনে সহসাই ভেসে ওঠে। আঞ্চলিক ভাষায় বলতে হয়, বোগড়ার আলুঘাটি , দই, পত্তে আর মাস্তানের কটকটি।

এর মধ্যে প্রথম দুটো নিয়ে বেশি আলোচনা হয় । কারণ অতিথি আপ্যায়নে যেটি সব সময় দেওয়া হয় বগুড়ার ঐতিহ্যের সাথে এই দুটি খাবার ওতোপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে বগুড়ার মানুষের সাথে। 

বগুড়া অঞ্চলের যেকোনো মজলিশ বা বড় আয়োজন মানেই আলুঘাটি। আর খাওয়া শেষে  থাকবে দই। এই খ্যাতি শুধু দেশ নয়, বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়েছে বহু আগে।  

কিন্তু আলুঘাটির প্রচলনটি কিভাবে ঘটল তার বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। কৃষিতে সমৃদ্ধ বগুড়া জেলার ফসলগুলোর মধ্যে অন্যতম আলু। এ থেকে ধারণা করা যায়, আটপৌড়ে জীবনের আহারের তালিকায় আলু প্রথম সারির স্থান দখল করবে এটাই স্বাভাবিক।   এক পাকে রান্না করে খাওয়াতে সুবিধার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান, মজলিশ, বন্ধুদের নিয়ে মিলনমেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে আলুঘাটি সবার প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে।

তবে প্রবীণ ব্যক্তি ও ভোজনরসিকদের ভাষ্যে জানা যায়, বগুড়াসহ আশপাশের জেলাগুলোতে মাছ দিয়ে আলু ঘাটির প্রচলন ছিল। সেই আলু ঘাটি থেকেই মাংস আলুর প্রচলন হয়েছে। জেলার পশ্চিমের দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, নন্দীগ্রাম উপজেলায় এখনও যেকোনো বড় আয়োজনে মাছ দিয়ে আলুঘাটি দেখা যায়। এখানেও লক্ষ্যনীয় যে, এই উপজেলাগুলোতে মাছ চাষের ব্যাপকতা রয়েছে।

মাছের আলুঘাটিকে ছাপিয়ে হালের যুগে অবশ্য মাংসের ব্যবহার বেড়েছে। এতে আলুঘাটির সুনাম কমেনি। বরং এই ঐতিহ্যের জৌলুসের মাত্রাকে আরও বাড়িয়েছে। একটা সময় বগুড়ার বিভিন্ন মজলিশে, ওরশ মাহফিলে মাংসের আলুঘাটির ব্যাপক প্রচলন ছিল। সাম্প্রতিককালে এই প্রচলন কিছুটা কমেছে। সেই জায়গা দখল করেছে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বিভিন্ন বড়-ছোট উৎসব।

আলুঘাটিতে আরেকটি বিষয় রয়েছে, সেটি হলো হাগড়াই নামের খুব আঠালো জাতের আলু। অল্প কিছু দিন আগেও ঘাটিতে হাগড়াই দেয়াটাও একটা নিয়মের মধ্যে ছিল। এখন সেটি অবশ্য কিছুটা শিথীল হয়েছে।

ভরপেট আলুঘাটি খাওয়ার পর পাতে দই থাকবে না তা কি হয়? না থাকলে তো বোগড়ার মানুষের নামই থাকবে না। জিআই (ভৌগলিক নির্দেশক) স্বীকৃতি পাওয়ার পর বগুড়ার দই বিশ্বব্যাপী সুনাম ছড়িয়েছে।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রায় আড়াইশ বছর আগে শেরপুর উপজেলা থেকে বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস শুরু হয়। পরবর্তীতে ঘোষদের হাত ধরে ধীরে ধীরে এটি চলে গেছে মুসলিম সম্প্রদায়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের কাছে।

এখন আমরা যেমন দই খাই, অর্থ্যাৎ মিষ্টি ও ঘন; শুরুতে তেমন ছিল না। তৎকালীন বগুড়ার শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ঘেটু ঘোষ প্রথম দই তৈরি শুরু করেন। টক দই তৈরি থেকে বংশ পরম্পরায় তা চিনিপাতা বা মিষ্টি দইয়ে রূপান্তরিত হয়।

প্রকৃতপক্ষে বগুড়া তথা শেরপুরের মাটি ও পানিই আর সব এলাকা থেকে আমাদের দইকে আলাদা করেছে। সরার দইয়ের পথিকৃত শেরপুরে ঘোষপাড়ার নীলকণ্ঠ ঘোষ। প্রায় ১৫০ বছর আগে তার হাতেই সরার দই প্রসার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে ১৮ শতকের শেষের দিকে বগুড়ার নওয়াব আলতাফ আলী চৌধুরীর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর বাবা) পৃষ্ঠপোষকতায় শেরপুরের ঘোষপাড়ার অন্যতম বাসিন্দা শ্রী গৌর গোপাল পাল বগুড়া শহরে দই উৎপাদন শুরু করেন।

বর্তমানে নওয়াববাড়ি রোডে তার উত্তরসূরি শ্রী বিমল চন্দ্র পাল ও শ্রী স্বপন চন্দ্র পাল ‘শ্রী গৌর গোপাল দধি ও মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামে সেই প্রাচীন বানিজ্য বিতানটি চালু রেখেছেন।

আমাদের যে কোনো অনুষ্ঠানে, উৎসবে সুস্বাদু খাবারগুলোর মধ্যেই আরেকটি চর্চিত বিষয় হলো বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষা। যে কোনো এলাকার আঞ্চলিক ভাষা সেই এলাকার মানুষের কাছে যেমন মধুর। বগুড়াও তার বাইরে নয়। বহুদিন পর প্রিয়জনদের দেখা হলেই মুখে ফোটে বগুড়ার ভাষার ফুলঝুড়ি- হামি, তুমি, মুই হামরা। তবে গান, গল্প, কবিতা আর উপন্যাসে তেমন ঠাঁই নেই এই ভাষার। যতটুকু পাওয়া যায়, তাও ক্রমাগত ক্ষয়ে যাচ্ছে।

ভাষা নিয়ে বগুড়ার মানুষের সচেতনতা কিন্তু খারাপ বলা যায় না। ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালেই। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ প্রখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

১৯৪৮ সালের ১৩ মার্চ কেন্দ্রীয় ছাত্র কর্মসূচী অনুযায়ী বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী মিছিল বের করে। মিছিলটি বগুড়া শহর প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন বগুড়ার সর্বস্তরের মানুষ। 

আর বোগড়ার ভাষা (আঞ্চলিক ভাষা) বেঁচে রাখতে ৪৮ বছর ধরে করে যাচ্ছেন সাংস্কৃতিককর্মী তৌফিকুল আলম টিপু। আঞ্চলিক ভাষায় লেখা আছে তার হাজার খানেক গান। আছে গল্প, কবিতা।

শুদ্ধ ভাষার চর্চা করতে গিয়ে দিনকে দিন প্রমিত ভাষা কেড়ে নিচ্ছে মায়ের মুখ থেকে শেখা এমন শব্দ আর আঞ্চলিক ভাষাগুলো। আঞ্চলিক স্বতন্ত্র রক্ষায় এই ভাষাগুলো বাঁচাতে দরকার পৃষ্ঠপোষকতা। গানের কথা আর বাস্তবতা মিল্যাইতো হাজার বছর আগেকার পুরানা সভ্যতা, বেহুলা লখিন্দর আর অলি আউলিয়ার ইতিহাস লিয়ে জাগ্যা আছে আজক্যার বোগড়্যা।

দেশে বিদেশে বিভিন্ন কর্মময়তায় বগুড়াকে তুলে ধরেছেন এমন কৃতিসন্তান যাদের সংবর্ধনা দেয়া দেওয়া হয়েছে তারা হলেন, প্রফুল্ল চাকী, শ্যামল ভট্টাচার্য, প্রজা বন্ধু রজীব উদ্দিন তরফদার, রোমেনা আফাজ, পরিচালক সুভাষ দত্ত, আরাফাত রহমান কোকো, তৌফিকুল ইসলাম টিপু, মোজাম্মেল হক লালু, হেলেনা খানম ইরানি, আমরা কজন শিল্প গোষ্ঠীর রূপকার আব্দুস সামাদ পলাশ।প্রথম বগুড়া ফেস্ট এর আহ্বায়ক বিশিষ্ট সাংবাদিক আতিকুর রহমান রুমন বিরামহীন পরিশ্রম করেছেন রাজধানীর বুকে "এক টুকরো বগুড়া "র এই আয়োজনটাকে চুড়ান্ত রুপ দিতে। তিনি ঢাকাস্থ বগুড়ার বিভিন্ন শ্রেনী পেশার লোকজন বগুড়া ফেস্ট -২০২৫ অংশগ্রহণ করে সহযোগিতা করায় বগুড়া বাসীর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।