বন অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন সুফল প্রকল্পে চলছে হরিলুট

বাংলাদেশ বন বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন টেকসই বন ও জীবীকা (সুফল) প্রকল্পে চলছে হরিলুট। খোদ প্রকল্প পরিচালকের উদাসীনতা ও যথাযথ তদারকীর অভাবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা যথেচ্ছা লুটপাট চালালেও দেখার কেউ নেই।

বন অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন সুফল প্রকল্পে চলছে হরিলুট

বাংলাদেশ বন বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন টেকসই বন ও জীবীকা (সুফল) প্রকল্পে চলছে হরিলুট। খোদ প্রকল্প পরিচালকের উদাসীনতা ও যথাযথ তদারকীর অভাবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা যথেচ্ছা লুটপাট চালালেও দেখার কেউ নেই। বন অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে ১৫০২ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ রেখে এই মেগা প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু করা হয়। জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩ সময়কালের মধ্যে এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

জুলাই ২০১৮ থেকে কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয় ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে। এ পর্যন্ত ৩জন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। প্রত্যেককেই দায়সারা গোছে কাজ করে অন্যত্রে বদলি হয়েছেন। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক গোবিন্দ রায় গত ডিসেম্বর ২০২০ মাসে এ প্রকল্পের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর এই দীর্ঘ দেড় বছরে শুধু মিটিং সিটিং নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করেছেন। মাঝে মধ্যে ২/১ ডিভিশনে তদারকির নামে গেলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অফিসে বসেই কাগজপত্রে প্রকল্পের অগ্রগতি দেখে ফিরে এসেছেন। সরেজমিনে খুব কম বাগানই পরিদর্শন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে এই প্রকল্পে আরো ৩ জন উপ-প্রকল্প পরিচালক ২ জন সহকারি পরিচালক সহ বেশ কয়েকজন পরামর্শক রয়েছেন যাদেরকে প্রকল্পের লাখ লাখ টাকা সম্মানী দিতে হচ্ছে। পরামর্শকদের মধ্যে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ শফিউল আলম চৌধূরী মাঝেমধ্যে ২/১টি বাগান পরিদর্শনে দেখা গেলেও অন্যান্য পরামর্শকদের উপস্থিতি খুবই কম পরিলক্ষিত হয়ে থাকে বলেও সূত্র জানায়। প্রকল্পের শুরুতে প্রশিক্ষণের নামে প্রকল্পের টাকার সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কর্মকর্তারা বিদেশ সফর করেন। যাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হয় তারা ইতোমধ্যে অনেকেই অবসরে চলে গেছেন। ফলে প্রকল্পের উন্নয়নে তাদের প্রশিক্ষণ কোন কাজে লাগে নি অথচ এই  প্রশিক্ষণের নামে ১১৩ কোটি টাকা লুটপাট হয়। এই কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রশিক্ষণ নিয়েও সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন ওঠে। 

প্রকল্পটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও প্রকল্পের এলাকায় বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয় বর্ধক কাজের সৃষ্টি করা। বন ও রক্ষিত এলাকা সংলগ্ন ৬০০টি গ্রামে ৪০ হাজার বন নির্ভর পরিবারের উন্নয়ন করা। ৫২ হাজার ৭২০ হেক্টর বৃক্ষশূন্য পাহাড়ী ও সমতল বনভূমিতে  বনাচ্ছাদন, নতুন জেগে ওঠা চরে ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজন করা, ২০টি রক্ষিত এলাকায় ২ হাজার ৫শ হেক্টর বন্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং ১ হাজার ৩৩০ হেক্টর এলাকায় বন্যপ্রাণী চলাচলের পথের উন্নয়ন, ৬টি রক্ষিত বনে রক্ষিত বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন, পাখিশুমারি ও  রিং কার্যক্রম পরিচালনা করা, দেশের জাতীয় বনাঞ্চল ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা ও ৯৩টি ভবন নির্মান করা।

সূত্রমতে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর এই ৩ বছরে দেশের ২০টি বন বিভাগকে সুফল প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ২৯১ কোটি ২৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ৫টি বনবিভাগকে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়। কক্সবাজার ২টি বনবিভাগকে ৮১ কোটি ৩৮ লাখ ৯৫ হাজার এবং চট্টগ্রামের ৩টি বন বিভাগকে ৬৯ কোটি ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বনাঞ্চলের ৫৭৯০ হেক্টরে স্ট্যান্ড ইমপ্রææভমেন্ট বনায়ন করার কথা। বর্তমানে এর অগ্রগতি ৪০ শতাংশের ও কম। যে সব চারা লাগানো হয়েছে সেগুলোর আগাছা পরিষ্কার করা হয়নি। পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে ৪০ শতাংশ চারা। আবার উক্ত ৫টি বনবিভাগের যে সকল রেঞ্জে সুফল বাগান করা হয়েছে সেখানে কোথাও অর্ধেক আবার কোথাও দুই-তৃতীয়াংশ বনভূমিতে বাগান করে বাকী টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় প্রায় প্রতিটি বাগানেই টেকসই বন ও জীবিকা (সফল) প্রকল্পের দিকনির্দেশনা উপেক্ষিত হয়েছে।

বনায়নের জৈব সার, রাসায়নিক সার প্রয়োগ সহ প্রতিটি গাছের সাথে খুঁটি লাগানোর নিয়ম থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। বনায়নের চিকবাশি,গামার, আকাশমনি, চাতিয়া, বকাইন, করই, শিমুল, বহেরা, অর্জুন গাছ লাগানোর নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। অপরদিকে ৬ ফুট অন্তর চারা রোপণের কথা থাকলেও একেকটি চারার দূরত্ব করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ ফুট। চারা রোপণের পূর্বে গোবর সার ও রাসায়নিক সার দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি। আর এ কারণেই প্রায় ৪০ শতাংশ চারা ইতিমধ্যে মারা গেছে। তাছাড়া বাগানের সম্মুখভাগের বাগান কিছুটা নিয়মমাফিক হলেও ভেতরে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। কারণ হিসেবে জানা যায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাগান পরিদর্শনে গেলে সম্মুখভাগের বাগান দেখেই চলে আসেন। বাগানে বিভিন্ন পোকামাকড় ও কাদা পানি থাকায় তারা ভিতরে ঢুকতে চান না। আবার অনেক কর্মকর্তা পাহাড়ে উঠতে চান না। আর এই সুযোগটাই বাগান তৈরীর কাজে নিয়োজিতরা নিয়ে থাকেন। 

কক্সবাজার বন বিভাগ থেকে বদলি হওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুফল বাগান করার জন্য হেক্টরপ্রতি বরাদ্দকৃত টাকা থেকে ৩৫ পার্সেন্ট টাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার নামে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অফিস থেকে কেটে নেয়া হয়। বাকি ৬৫ শতাংশ টাকা দিয়ে ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ অফিসার গণের শতভাগ বনায়ন করা সম্ভব হয় না। তারপর তাদেরও মাঝে মধ্যে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে হয়। ফলে বাকি টাকার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকায়ও বাগান করা সম্ভবপর হয়ে উঠেনা। এরপর রেঞ্জ কর্মকর্তা, বীট কর্মকর্তা, ফরেস্ট গার্ড তো রয়েছে। তারাও তো কষ্ট করে বাগান করতে গিয়ে উপরি দু'পয়সা আয় করতে চায়।

সূত্র মতে চলতি ২০২১-২২ অর্থবর্ষেও বাগান করতে বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। বেশীরভাগ বাগানে চারা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। অল্পদিনের মধ্যে গাছ লাগানো হবে। অন্যদিকে বাগান করার পূর্বে শ্রমিকদের ডাটাবেজ করার কথা থাকলেও কক্সবাজারে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। এই ডাটাবেজ নিয়োগকৃত দিনমজুররা সারা বছর কাজ করার কথা। ডাটাবেজে উল্লেখিত শ্রমিকদের এনআইডি কার্ড সংরক্ষণসহ মাস্টাররোলে সই স্বাক্ষর রাখার বিধান রয়েছে।

কিন্তু বিট ও রেঞ্জ অফিসারগণ রোহিঙ্গা নেতাদের মাধ্যমে শত শত রোহিঙ্গাকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্যাম্প থেকে বের করে এনে তাদেরকে দিয়ে বাগানের মাটি কাটা, ব্যাগে মাটি ভরা ও ব্যাগে বীজ দেয়ার কাজ করিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে মাস্টাররোলে দিনমজুরদের মাথাপিছু ৫/৬শ টাকা হারে পারিশ্রমিক তুলে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের ১৫০/২০০ টাকা দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করে। এসকল রোহিঙ্গা শ্রমিকদের জাল এনআইডি কার্ড বানিয়ে ভুয়া নাম ঠিকানা ও আইডি নং বসিয়ে প্রিন্ট করে সরকারী ফাইলে সংরক্ষিত করা হচ্ছে।

আবার গোবর সার, রাসায়নিক সার, বাঁশের খুঁটি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা কিছু ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে কাগজপত্রেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কোন মাল সাপ্লাই ছাড়াই ঠিকাদারকে বরাদ্দকৃত টাকার ১০শতাংশ নগদ দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করার ও অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারনেই গাছের গোড়ায় সার দেয়া বা খুটি লাগানো হয়না। কক্সবাজার থেকে বদলি হওয়া ওই কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, বনায়ন কর্মসূচী সফল করার জন্য হেক্টর প্রতি যে অর্থ সরকারি কাগজপত্রে দেখানো হয় তা বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তার হাতে সঠিকভাবে পৌছায় না।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে নামে পার্সেন্টেজ দিতে দিতে বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তার হাতে যে অর্থ পৌঁছায় তা বিষফোড়ায় পরিণত হয়। না পারে কইতে না পারে সইতে। কেউ অপারগতা প্রকাশ করলে তার ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। হয় অন্যত্রে খারাপ জায়গায় বদলী নতুবা তাকে বসিয়ে রেখে আস্থাভাজন কর্মকর্তাকে দিয়ে দায়সারা গোছের বনায়নের কাজ সমাধা করে। কর্মসূচী শেষে নিয়ন্ত্রনকারী কর্মকর্তা পরিদর্শনে গিয়ে ৯০ শতাংশ সাকসেস দেখিয়ে আদেশ বইতে লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে বাগানের অস্তিত্ব না পেলে সম্পূর্ণ দায়ভার চাপে বীটে কর্মরতদের উপর। তার মতে, সুফল প্রকল্পে এত অনিয়ম শুধুমাত্র প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শ গনের যথাযথ তদারকী ও সরেজমিন পরিদর্শনের অভাবেই হচ্ছে। তারা যথাযথ তদারকি করলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভবপর হবে। শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করলে বাস্তবে ৫০ শতাংশ বাগানও হবে না।