বনখেকো বশিরের রাজত্বে বিলীন টেকনাফের উপকূলীয় বন, নেপথ্যে ডিএফওদের ‘অদৃশ্য’ আশির্বাদ
উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের আওতাধীন সবচেয়ে দুর্গম ও দূরবর্তী অঞ্চল টেকনাফ রেঞ্জ এখন এক ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা আর দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের আওতাধীন সবচেয়ে দুর্গম ও দূরবর্তী অঞ্চল টেকনাফ রেঞ্জ এখন এক ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা আর দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই রেঞ্জের হর্তাকর্তা হিসেবে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন ডেপুটি রেঞ্জার মো. বশির আহমেদ খান। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য—কীভাবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের (ডিএফও) ম্যানেজ করে একের পর এক বাগান সৃজনের বরাদ্দ লুটে নিয়েছেন তিনি, আর উজাড় করেছেন মাইলের পর মাইল সংরক্ষিত বনভূমি।
তৎকালীন ডিএফও আব্দুর রহমানের হাত ধরে এই রেঞ্জে বশিরের রাজকীয় অভিষেক ঘটলেও পরবর্তীতে মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন এবং বর্তমান ডিএফও এম এ হাসানের সময়কালেও তিনি বহালতবিয়তে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লা সংলগ্ন কাটা পাহাড় এলাকায় ডিএফও অফিস থেকে টেকনাফ রেঞ্জের দূরত্ব প্রায় ১৮০ কিলোমিটার হওয়ার সুযোগটি পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগিয়েছেন বশির। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দূরত্বের দোহাই দিয়ে সচরাচর পরিদর্শনে না আসার সুযোগে তিনি গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক অভেদ্য দুর্গ।
টেকনাফ রেঞ্জের অধীনে সদর বিট, শাহপরীর দ্বীপ বিট, হ্নীলা বিটসহ জাদিমুরা, নয়াপাড়া ও হোয়াইকং ক্যাম্প অফিসের বিশাল এলাকা বশিরের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাস্তবে সেখানে বনের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। সুফল প্রকল্প, অনুন্নয়ন ব্যয় এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে হাজার হেক্টর বনভূমি ও কয়েকশ কিলোমিটার বাঁধ বাগান সৃজনের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ আছে, বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ টাকা ডিএফওদের তুষ্ট করতে ব্যয় করা হয়, আর বাকি টাকা কোনো প্রকার বাগান না করেই পকেটে ভরেন বশির। বনের জায়গা এখন দখলদারদের স্বর্গরাজ্য; যেখানে বশিরের মৌখিক বা লিখিত সম্মতিতে টাকার বিনিময়ে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল চিংড়ির ঘের, লবণ মাঠ, পানের বরজ ও অবৈধ সব স্থাপনা। বন রক্ষার শপথ নিয়ে বশির আহমেদ বন বিক্রির মহোৎসবে মেতে উঠেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে বশিরের ব্যক্তিগত জীবন ও দাপ্তরিক আচরণ নিয়েও। একাধিক ফরেস্ট গার্ড নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই কর্মকর্তা অধিকাংশ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হন। মাঝেমধ্যে কর্মস্থলে এলেও তিনি মদ্যপ অবস্থায় থাকেন এবং অধীনস্থ কর্মচারীদের অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন ঔদ্ধত্য এবং বেপরোয়া জীবনযাপনের নেপথ্যে খোদ ডিএফওদের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের জোরালো দাবি।
সরকারি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে টেকনাফে নিজের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনীহা সাধারণ বনকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করেছে। মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে না পাওয়া যাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। সচেতন মহলের মতে, অতি দ্রুত এই ‘অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী’ বশিরকে অপসারণ করে সুষ্ঠু তদন্ত না করলে টেকনাফের মানচিত্র থেকে বনভূমি স্থায়ীভাবে মুছে যাবে।